বিচার চাইতে গিয়ে আদালত প্রাঙ্গণেই মারধরের শিকার হলেন মামলার বাদী। জামালপুরে নাশকতার একটি মামলার শুনানি শেষে বাদী মো. রাসেল হোসেনকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে ওই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় জান্নাতুল হুমায়রা ওরফে জেমি নামের এক নারীকে আটক করে পুলিশ। পরে আদালতে হাজির করা হলে তিনি মারধরের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে কোর্ট পুলিশ। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাঁর জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিকেলে জামালপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে এ ঘটনা ঘটে।
মারধরের শিকার রাসেল হোসেন জামালপুর সদর উপজেলার লাঙ্গলজোড়া এলাকার বাসিন্দা। এ ঘটনায় মাথায় আঘাত পেয়ে তিনি জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
কোর্ট পুলিশ ও আহত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার মুন্সীনাংলা এলাকায় একটি শিল্পকারখানায় চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, জান্নাতুল হুমায়রা, মাসুদ, সামিউল ইসলাম ওরফে জাম্বুর, আমিনুর ইসলাম ওরফে ফকির এবং আক্তার হোসেনের নেতৃত্বে একদল ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কারখানাটিতে হামলা চালান। এ সময় ফাঁকা গুলি ছোড়া ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনায় ওই দিনই মেলান্দহ থানায় বাদী হয়ে নাশকতার মামলা করেন রাসেল হোসেন।
মঙ্গলবার ওই মামলার শুনানির দিন ধার্য ছিল। শুনানি শেষে রাসেল আদালত প্রাঙ্গণে তাঁর আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ সময় জান্নাতুল হুমায়রা ও মাসুদের নেতৃত্বে কয়েকজন আসামি তাঁর ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁরা রাসেলের গেঞ্জির কলার ধরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে কিল-ঘুষি ও লাথি মারেন। এতে তিনি আহত হন। এ সময় আদালত প্রাঙ্গণে দায়িত্ব পালনরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জান্নাতুল হুমায়রাকে আটক করেন।
রাসেল হোসেন বলেন, ‘মামলাটি প্রত্যাহার করার জন্য আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে আমাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছিলেন এবং হুমকি দিচ্ছিলেন। মঙ্গলবার মামলার শুনানি শেষে আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলছিলাম। এ সময় পরিকল্পিতভাবে জান্নাতুল হুমায়রা ও মাসুদের নেতৃত্বে আসামিরা আমার ওপর হামলা চালান। তাঁরা আমাকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি ও লাথি মারেন। মাথায়ও আঘাত করেন। মারধরের সময় মামলা তুলে না নিলে হত্যার হুমকি দেন তাঁরা।’
এর আগে ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি জামালপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত জান্নাতুল হুমায়রার এক আত্মীয়ের জামিন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে জান্নাতুল হুমায়রার নেতৃত্বে অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ আদালত প্রাঙ্গণে হট্টগোল করেন। এ সময় তাঁরা পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কিতেও জড়ান। ওই ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।
জামালপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. রিশাদ রেজওয়ান বাবু বলেন, ‘আদালত প্রাঙ্গণ বিচারপ্রার্থী মানুষের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও সুরক্ষিত জায়গা হওয়ার কথা। সেখানে একজন মামলার বাদীকে মারধরের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও নিন্দনীয়। আদালত প্রাঙ্গণে এ ধরনের ঘটনা শুধু বিচারপ্রার্থীদের নিরাপত্তাকেই বিঘ্নিত করে না, বরং বিচারব্যবস্থার পরিবেশ ও আদালতের মর্যাদাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে, যাতে কোনো বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী কিংবা সাধারণ মানুষ এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার না হন।’
জামালপুর কোর্ট ইন্সপেক্টর (ওসি) মো. খান আব্দুল হালিম সিদ্দিকী বলেন, ওই মামলার শুনানির দিন ধার্য ছিল মঙ্গলবার। শুনানি শেষে ওই নারীসহ কয়েকজন আসামি মামলার বাদীকে মারধর করেন। বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হলে আদালতের নির্দেশে ওই নারীকে আটক করে বিচারকের সামনে হাজির করা হয়। এ সময় তিনি নিজেই আদালতে মারধরের বিষয়টি স্বীকার করেন। পরে আদালত তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।





