বর্তমান সময়ে ফেসবুক ব্যবহার করেনা এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ফেসবুকের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় দু'শত কোটি যা গত বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি।
আবার ইন্টারনেট নজরদারি ভিত্তিক ওয়েবসাইট ইন্টারনেট লাইভ স্ট্যাটাসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ এর জুলাই মাস পর্যন্ত হিসেবে ধরলে বর্তমানে বিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৪২কোটি। তাহলে আমরা দেখছি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সাথে সাথে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় একই হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশেও এদিক থেকে পিছিয়ে নেই। গ্লোবাল ডেটা ফার্ম স্ট্যাটিস্টার তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪.৮কোটি।
যা মোট ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যার হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দশম। তবে আগামী ৫ বছরে হয়তো এই ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক হতে পারে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ ফেসবুক ব্যবহারকারী (৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ) পুরুষ। এছাড়া বাংলাদেশের ১৮-২৪ বছর বয়সী ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২কোটি। মেটার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ফেসবুকের সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা যেসব দেশে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়।
তবে আজকের আলোচনার বিষয় হচ্ছে ফেসবুক আমাদের জন্য কতটা নিরাপদ এবং ব্যবহারকারীরাও কতটুকু নিরাপদে এটি ব্যবহার করতে পারছেন। আসুন একটি ঘটনা বলি, ফাহিম ফয়সাল একজন কন্টেন্ট নির্মাতা, যার অনুসারীর সংখ্যা লাখের অধিক। হঠাৎ ২০১৯ সালে তার ফেসবুক একাউন্ট হ্যাক হয়।
তিনি অন্য একটি ফেসবুক একাউন্ট থেকে তার আইডিতে নক দিলে হ্যাকার দাবি করে মোটা অংকের টাকা। তাছাড়া বলা হয় টাকা না দিলে তার আইডিতে বিভিন্ন অশ্লীল ছবি, ভিডিও পোস্ট করা হবে। এক পর্যায়ে সে পুলিশে আশ্রয় নিলে গ্ৰেপ্তার হয় হ্যাকার। বিশে'র কৌটা পেরিয়ে ২১বছরে পা দেওয়া এই যুবক প্রবেশ করে হ্যাকিংয়ের জগতে এবং হ্যাকিংকে পরিচালিত করে ভুল পথে।
আরেকটি ঘটনা বলি, মিরপুরের সাফিনের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই আপনাদের। কয়েক বছরের প্রেম ভেঙে যায় তাদের। তার সাবেক প্রেমিকা মিশতে থাকে তার ছেলে বন্ধুদের সাথে যা দেখে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেন সাফিন। সম্পর্কে থাকাকালীন প্রেমিকার ধারণকৃত আপত্তিকর ভিডিও সে দিয়ে দেয় পমপম গ্ৰুপে। এরপর সাবেক প্রেমিকার জীবনে নেমে আসে এক ভয়ংকর অধ্যায়। ভাইরাল হওয়া ভিডিও চলে যায় সাবেক প্রেমিকার সকল বন্ধু-বান্ধবের কাছে।
মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পরে প্রেমিকা। কয়েকবার আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েও ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরলেন। তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তার পরিবারের সকল সদস্যরা। অবশেষে পুলিশের হস্তক্ষেপে সাফিন গ্ৰেপ্তার হয় আর বেড়িয়ে আসে এসব ভয়ংকর তথ্য। প্রতিনিয়ত এমন হাজারো সাফিন ফেসবুকের অপব্যবহারের মাধ্যমে জীবন্ত লাশ বানিয়ে দিচ্ছে হাজারো সহজ-সরল মানুষকে। এছাড়া সহজ সরল ভাবে ফেসবুক একাউন্ট খুলে ব্যবহার করা মানুষরাও আছে চরম হতাশায়। কেননা এদের আইডি গুলোতে ফেসবুকের রাখা কঠিন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গুলো চালু করা থাকে না।
ফলাফল স্বরূপ এদের আইডি গুলো খুব সহজেই হ্যাক হয়ে যায় আর তারা চরম বিপদের সম্মুখীন হয়ে পড়ে। তাছাড়া ফেসবুকের আরো কত শত অপব্যবহার হচ্ছে তা গুণে শেষ করা যাবে না। যেমন ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, আপত্তিকর বিভিন্ন ছবি, ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে মানুষের ব্যাক্তিগত নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলা ইত্যাদি। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে আমি বলতে পারি, ফেসবুক আমাদের সঠিক নিরাপত্তা দিতে পারছে না। কিভাবে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফেসবুক হ্যাক করে একজন মানুষকে জীবন্ত লাশ বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ কেন আরো সচেতন হচ্ছে না এটাও একটা প্রশ্ন। এখানে ফেসবুকের দায়বদ্ধতার চেয়ে আমাদের অসৎ চিন্তা ভাবনায় সবচেয়ে বেশি দায়ী।
বর্তমানে ফেসবুক একাউন্ট হ্যাক করা একটা সহজতর বিষয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই ফেসবুক হ্যাকিংয়ে যারা যুক্ত তাদের অধিকাংশই হচ্ছে তরুণ। বিবিসি বাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ফেসবুক হ্যাকিংয়ের দাবী দেখা গেছে ব্ল্যাক ৪২০ স্প্যামিং টিমে এর ফেসবুক পাতায়। সেখানে বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের ফেসবুক আইডি, ফেসবুক পেজ বা গ্রুপ ডিলিট করা, অকার্যকর করার অসংখ্য ঘোষণা রয়েছে। তাছাড়া মাদারীপুর ছাড়াও কুমিল্লা, রংপুর, গাজীপুর ইত্যাদি জেলায় এরকম হ্যাকারদের বড় চক্র রয়েছে। নাটোরের লালপুরে রয়েছে ইমো হ্যাকিংয়ের একটি বড় চক্র। এতো অল্প বয়সেই এরা তাদের এই আইসিটি দক্ষতা ব্যবহার করছে মানুষের ক্ষতির জন্য।
হারিয়ে গেছে মানুষের নৈতিকতা। শেষ কোথায় এসব অপব্যবহারের? নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলছি মাস ছয়েক আগেই আমার ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়েছিল। মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। সেদিন থেকে ফেসবুকে আমার ভরসা উঠে গেছে। তারপর এক ভাইয়ার মাধ্যমে আইডি উদ্ধার করি। সবাই আইসিটি জ্ঞানের অপব্যবহার করেনা, তবে এদের সংখ্যা অপব্যবহারকারীর তুলনায় খুবই নগণ্য।
তাই সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশে ফেসবুক হ্যাকিং হওয়ার পিছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে ব্যবহারকারীর অসচেতনতা আর আইসিটি বিষয়ে দক্ষদের অনৈতিক মানসিকতা, আসুন আমরা ফেসবুক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হই আর না হয় তা ব্যবহার থেকে বিরত থাকি। তা না হলে অসচেতন ভাবে ফেসবুক ব্যবহার আমাদের জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে।
মোঃ রাকিব ইংরেজি বিভাগ, সরকারি সিটি কলেজ চট্টগ্রাম।





