তিন দশকের জমে থাকা জমি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ, একের পর এক মামলা, সংঘর্ষ, এবং ব্যর্থ সালিশ-সমঝোতার চেষ্টাগুলোকে পেছনে ফেলে মানবিক উদ্যোগে বিরল এক উদাহরণ গড়লো জামালপুর পুলিশ।
দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে চলা জমি সংক্রান্ত বিরোধ শেষ পর্যন্ত মীমাংসিত হয় পুলিশের চার দিনের ধারাবাহিক সালিশি বৈঠকের মাধ্যমে। ফলে, দুই চাচাতো ভাইয়ের পরিবার এখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটছে। বিরোধের অবসানে আনন্দ ভাগাভাগি করতে দুই পরিবার আয়োজন করে ৪০০ মানুষের মিলনমেলার ‘মিলি ভাত’।
ঘটনাটি জামালপুর শহরের শেখেরভিটা এলাকার। বিরোধে জড়িতরা হলেন—মৃত আব্দুল খালেকের ছেলে শাকিল আহম্মেদ ইকবাল (৪২) ও মৃত নুরুল হকের ছেলে নজরুল ইসলাম (৪৯)। সম্পর্কে চাচাতো ভাই হলেও দীর্ঘকাল জমির মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিলেন তারা।
ফুফু মর্জিনার নামে থাকা মোট ১৩ শতাংশ জমি থেকে নজরুল ইসলাম ৭.৩১ শতাংশ ও শাকিল আহম্মেদ ইকবাল ৫.৭০ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। এরপর থেকেই জমির সড়ক, দাগ ও খতিয়ান ঘিরে শুরু হয় বিরোধ। ২০১২ সালে দ্বন্দ্ব সংঘর্ষে রূপ নেয়, যার পরিণতিতে একে অপরের বিরুদ্ধে দায়ের হয় ১০টি মামলা।
বিগত এক দশকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার সালিশি উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোনো সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। মামলার ভারে ন্যুব্জ পরিবারদুটি এক পর্যায়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দুই পক্ষের ভাষ্যমতে, বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য তারা অন্তত ১০ বার বিভিন্ন জায়গায় মীমাংসায় বসেছিলেন, কিন্তু ফল শূন্য।
অবশেষে, এসআই মোহাম্মদ মোহেবুল্লাহ দায়িত্ব গ্রহণের পর মামলা হাতে পেয়েই শুরু করেন বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ। টানা চার দিন স্থানীয়দের নিয়ে বৈঠক করেন, ধৈর্য ধরে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন, দেন মীমাংসার প্রস্তাব। স্থানীয় ১১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হাবিবুর রহমান সাইফুল মণ্ডল, সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল হাসান বিপুলসহ রাজনৈতিক নেতারাও সহায়তা করেন সালিশে।
এসআই মোহেবুল্লাহ বলেন, “দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আমি লক্ষ্য করি—দুই পরিবারের জীবন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই বিরোধের জেরে মামলা তদন্তে ইতোমধ্যে ৩০ জন অফিসার বদলি হয়েছেন। আমার কাছে এটি শুধু একটি মামলা নয়, এটি দুই পরিবারের ভবিষ্যতের প্রশ্ন ছিল। আল্লাহর রহমতে স্থানীয়দের সহায়তায় আমরা সমাধানে পৌঁছাতে পেরেছি।”
নজরুল ইসলাম বলেন, “আমাদের জীবনের বড় সময় কোর্ট আর থানায় গেছে। অনেক টাকা ও সময় নষ্ট হয়েছে। এখন মনে হচ্ছে আমরা মুক্ত। এসআই মোহেবুল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।”
শাকিল আহম্মেদ ইকবাল বলেন, “পূর্বপুরুষের থেকে শুরু হওয়া এই বিরোধ আমাদের অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। অবশেষে শান্তির মুখ দেখেছি। আজ মনে হচ্ছে—আমরা সত্যিকারের আত্মীয়।”
বিরোধ নিষ্পত্তির পর দুই পরিবার যৌথভাবে এলাকাবাসীর জন্য আয়োজন করে মিলনমেলা ও আপ্যায়ন। এতে উপস্থিত ছিলেন শতাধিক প্রতিবেশী, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতারা।
জামালপুর সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইয়াহিয়া আল মামুন বলেন, “এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়টি আমাদের আইনেই রয়েছে। তবে একজন পুলিশ সদস্য সমাজকে এভাবে বদলে দিতে পারে, এটি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এসআই মোহেবুল্লাহ আমাদের গর্ব।”





