Thursday, 3 September 2026
শিরোনাম
ফিচার মতামত

সাংবাদিকতা কী সরকারি-বেসরকারি কারখানার ডিগ্রিসর্বস্ব চাকরি?

admin • 20 May 2024, 11:46 PM • পঠিত 1 বার
শেয়ার করুন:
সাংবাদিকতা কী সরকারি-বেসরকারি কারখানার ডিগ্রিসর্বস্ব চাকরি?

কাজী নজরুল ইসলাম বিএ পাস তো দূরের কথা, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হননি। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাউস ডিগ্রি নিয়ে আসা অনেকে তাঁর কোনো কোনো কবিতা বোঝার জ্ঞান মোটেও রাখেন না। প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা না থাকলেও তাঁর সাংবাদিকতা ডিগ্রিওয়ালা অনেকের কাছে অষ্টম আশ্চর্যের মতো বিস্ময়!

নজরুল গণমানুষের সাংবাদিকতা করেছেন, তিনি উপমহাদেশে গণসাংবাদিকতার পথিকৃৎদের অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধের পর প্রকাশিত প্রথম সরকারবিরোধী আলোচিত-সমালোচিত দৈনিক গণকণ্ঠের সম্পাদক আল মাহমুদ বড়জোর সপ্তম শ্রেণি পাস। ওই পত্রিকায় আজকের হিট কলামিস্ট মহিউদ্দিন আহমদ, দেশের স্বঘোষিত স্টিভ জবস মোস্তাফা জব্বাররা তাঁর অধীনে সাংবাদিকতা করেন। প্রকৃতি প্রদত্ত অপরিমেয় প্রজ্ঞাবান আল মাহমুদের 'সোনালি কাবিনের' কোনো কবিতার একটা লাইনের মতো কিছু সৃষ্টি করা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেটওয়ালা অনেক শিক্ষক, আমলার পক্ষে শুধু অসম্ভবই নয়, তাঁর কবিতা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা নিয়ে তারা এ জন্মে জন্মই নিতে পারেননি।

জাতীয় একটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত এক সাংবাদিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মান (বিএ) প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার সময়ই জাসদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে আচ্ছন্ন ছিলেন। বিপ্লবের ফাঁদে পড়ায় তাঁর আর সনদপত্র অর্জনের পড়াশোনা হয়নি। বাংলা, স্মার্ট ইংরেজি ভাষায় তাঁর যে দক্ষতা, এর তুলনা করলে শুধু এ দেশেই নয়, পুরো উপমহাদেশে তাঁর মতো খুব কমজনকে পাওয়া যাবে। বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক মাহমুদ জামাল কাদেরী বিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়ায় কথিত ডিগ্রি পাসের সনদপত্র অর্জন করতে পারেননি।

 

দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায়, তিনি যে সংবাদমাধ্যমে কাজ করবেন, তা সমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশ, প্রচার হবে। সাংবাদিকতায় জড়াতে বিএ পাস হতে হবে বলে যে সিদ্ধান্ত জানিয়েছে প্রেস কাউন্সিল, এর বিরোধিতার জন্য এমন অসংখ্য প্রমাণ সাংবাদিক সমাজে বিদ্যমান। সাংবাদিকতা সৃজনশীল পেশা, কোনোভাবেই তা সরকারি-বেসরকারি কারখানার ডিগ্রিসর্বস্ব চাকরির মতো নয়। সাংবাদিকতায় আসার ন্যূনতম যোগ্যতা, নীতিমালা কী হবে, তা নির্ধারণ করবেন দেশের অভিজ্ঞ সাংবাদিক, সম্পাদকরা।

আমলা, কোনো কাউন্সিল, সরকারি প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার 'ক্ষমতা' কোনো না কোনো আইনের মারপ্যাচে রাখলেও তারা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ নয়। জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিদিনের সংবাদের মূখ্য অংশ আসে ঢাকার বাইরে থেকে। সংবাদ ছাড়াও একাধিক কারণে সারাদেশের প্রতিনিধি, ব্যুরো প্রধান, সংবাদদাতাদের উপর নির্ভর করতে হয় জাতীয় প্রচারমাধ্যমগুলোকে।

ঢাকার বাইরের প্রতিনিধিদের বেলায় সাংবাদিকতা এখনো পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়নি, তাদের বেলায় 'শখ', 'নেশা' পর্যায়ে রয়ে গেছে। দেশের কোনো জেলা, উপজেলা থেকে 'নেশার' টানে যে প্রতিনিধি হতে চাইবেন, তার বেলায় ডিগ্রি পাসের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা প্রায় সময় অবাস্তব হয়ে যাবে। শুধু বড় ডিগ্রি থাকলেই সংবাদ লেখা, সম্পাদনা করা যায় না। পেশার প্রতি অদম্য আবেগ, মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, সমাজের প্রতি শুদ্ধ দায়বোধ, রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বশীল আনুগত্য না থাকলে সৎ সাংবাদিক হওয়া যায় না।

বেশি বছর আগের ঘটনা নয়, ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন তখন ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক। ঢাকা কলেজ থেকে ইংরেজিতে সম্মান (বিএ) পাস করা এক যুবক আনোয়ার স্যারের কাছে আসেন তাঁর পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে চাকরি করতে। যুবকের কয়েক দিনের পীড়াপীড়িতে স্যারের শিক্ষকমন গলে যায়। তাকে স্যার নিজস্ব প্রতিবেদক হিসেবে নিয়োগ দেন। কাজে যোগ দেয়ার প্রথমদিন ওই প্রতিবেদককে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ধরিয়ে দিয়ে প্রতিবেদন আকারে লিখতে বলেন তার পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটে, যুবক প্রতিবেদন সাজাতে পারছেন না, তাপ নিয়ন্ত্রিত কার্যালয়ে বসেও তিনি ঘামছিলেন। পাশে বসা এক সহকর্মী বিষয়টি আঁচ করতে পেরে যুবকের কাছে জানতে চান, তোমার গ্রামের বাড়ি কোন জেলায়? যুবক চাঁপাইনবাবগঞ্জ বললে সহকর্মী বলেন, জেলার নাম ইংরেজিতে বানান করতে। মানসিক চাপে অস্থির ওই নিজস্ব প্রতিবেদক নিজ জেলার ইংরেজি বানানও ভুলে যান তখন। অবশ্য চালাকি করে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটান তিনি। বলেন, আমাদের বাড়ি ঢাকা, ডিএইচএকেএ।●

লেখক: হাসান শান্তনু,সাংবাদিক ,লেখক ও কলামিষ্ট। 
মন্তব্য (0)

কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্যটি অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।