কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার উত্তর চাঁদপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আগুনের ঘটনা ঘটেছে। (৬ এপ্রিল) বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে বিদ্যালয়ের আধাপাকা টিনসেট ঘরের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের কক্ষে এই ঘটনা ঘটে।
এতে শিক্ষার্থীদের সনদপত্র, বই, গুরুত্বপূর্ণ নথি ও আসবাবপত্রসহ দুইটি কক্ষের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই ঘটনার সময় বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরী সোহান মোল্লা অনুপস্থিত ছিলেন।
তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের ভাষ্য, রোববার বিদ্যালয়টির পরিচালনা পরিষদের নির্বাচনের ভোট হওয়ার কথা। এনিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিরোধ চলছে। ভোটকে কেন্দ্র করে একপক্ষ তার প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে এই আগুনের ঘটনা ঘটাতে পারে।
আর আওয়ামী লীগের দু'পক্ষের নেতাকর্মীরা বিদ্যালয়ের আগুন নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছেন। একপক্ষ বলছেন, পরাজয়ের ভয়ে ভোট বন্ধ করতে প্রতিপক্ষরা বিদ্যালয়ে আগুন দিয়েছেন। অপরপক্ষ বলছেন, তাদের ফাঁসাতে প্রতিপক্ষরা আগুনের নাটক সাজিয়েছে।
আগুন লেগে পুড়ে গেছে বইসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র। ছবি: মিরর অব বাংলাদেশ
পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত একটার দিকে বিদ্যালয়ের প্রধান কার্যালয়ে আগুন দেখতে পান স্থানীয়রা। পরে খবর পেয়ে গ্রামবাসী আগুন নেভাতে ছুটে আসে এবং পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসে খবর দেয়। খবর পেয়ে রাত আড়াইটার দিকে শৈলকূপা ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসে। পরে স্থানীয়রা ও ফায়ার সার্ভিস প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ততক্ষণে বিদ্যালয়ের দু'টি ঘর, ঘরে থাকা বই ও বিদ্যালয়ের সব গুরুত্বপূর্ণ কাগজ পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
জানা যায়, বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদ নির্বাচন ঘিরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে যদুবয়রা ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. তৌহিদুল ইসলামের সঙ্গে ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. সবুজ আলী ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ সভাপতি আকাশ রেজার সমর্থক ও নেতাকর্মীদের বিরোধ ও উত্তেজনা চলছিল। আকাশ ও সবুজ পক্ষ ভোট বন্ধের জন্য উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও প্রিজাডিং কর্মকর্তার নিকট লিখিত অভিযোগ করেছেন।
রাত তিনটার দিকে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয় এলাকায় শতশত মানুষ। সেখানে পুলিশের সদস্যরাও রয়েছেন। বিদ্যালয়ের প্রধান কার্যালয় ও শিক্ষক কক্ষে আগুনের ধোঁয়া বের হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পানি দিয়ে আগুন নেভাচ্ছে। বই, প্রয়োজনীয় নথিসহ যাবতীয় মালামাল পুড়ে গেছে।
এসময় কথা হয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, আগামী রোববার বিদ্যালয়ে ভোট হওয়ার কথা। এনিয়ে স্থানীয় দুই গ্রুপের মধ্যে চরম উত্তেজনা চলছে। একপক্ষ ভোট বন্ধের জন্য লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। তাঁর ভাষ্য, বিদ্যালয়ের ভোট বন্ধ করতেই কোনো পক্ষ হয়তো বিদ্যালয়ে আগুন লাগিয়েছে। আগুনে বিদ্যালয়ের ২০০১ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সব গুরুত্বপূর্ণ নথি পুড়ে গেছে।
বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন খান বলেন, শিক্ষার্থীদের সনদ, বই, গুরুত্বপূর্ণ অফিসিয়াল কাগজ, আসবাবপত্রসহ দুইটি কক্ষের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
শুক্রবার সকালে আবারও সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, আগুনে পোড়া বিদ্যালয় দেখতে এসেছেন স্থানীয়রা। এসময় আনছার বিশ্বাস নামে এক এলাকাবাসী বলেন, যারা একাজ করতে পারে, তাঁরা মানুষও খুন করতে পারে। এদের কঠিন শাস্তির দাবি জানাই।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতা মো. তৌহিদুল ইসলাম জানান, রাত দুইটার দিকে তিনি আগুনের খবর পেয়ে ছুটে এসেছিলেন। কিভাবে আগুন লেগেছে তা তিনি জানেন না। তবে তার ধারণা, প্রতিপক্ষরা নির্বাচনে পরাজয়ের ভয়ে ভোট বন্ধ করতে এমন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিছে। আগুন নেভাতে সবাই আসলেও প্রতিপক্ষের কেউ আসেনি বলে জানান তিনি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রলীগ নেতা আকাশ রেজা ও যুবলীগ নেতা সবুজ আলী বলেন, মসজিদের মাইকে প্রচার শুনে তারা আগুন লাগার বিষয়টি জানতে পেরেছেন। তাঁদের ভাষ্য, বিদ্যুতের শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে। অথবা তাদের ফাঁসাতে প্রতিপক্ষরা এমন কাজ করতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে যদুবয়রা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমানকে ফোন দিলে তিনি তা ধরেননি।
শৈলকূপা ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুল আজিজ বলেন, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ও এলাকাবাসী মিলে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে আগুন লাগার কারণ ও ক্ষতির পরিমাণ তদন্তের পর জানা যাবে।
কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোহসীন হোসাইন বলেন, স্কুলে ভোট নিয়ে দু'পক্ষের বিরোধ চলছে। তার ধারণা, এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ফাঁসাতে এমন কাজ করতে পারেন। তবে তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে বলে তিনি জানান।





