জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার কানুপুর সরদারপাড়া গ্রামের এক বখাটে তরুণের বিরুদ্ধে রাতের বেলায় প্রতিবেশী গৃহবধূর ঘরে ঢুকে শ্লীলতাহানী ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে।
এঘটনায় রোববার (১৪ এপ্রিল) দুপুরে ভুক্তভোগী ওই গৃহবধূ নিজেই বাদী হয়ে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে থানা পুলিশ অভিযোগটি মামলা হিসেবে নেয়নি। পুলিশ অভিযুক্ত বখাটে তরুণকে থানায় ডেকে এনে শাসন করে ছেড়ে দিয়েছে বলে ভুক্তভোগী গৃহবধূ অভিযোগ করেছেন।
পুলিশের এমন আচরণে ভুক্তভোগী গৃহবধূ, তার স্বামী ও স্বজনেরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এঘটনায় এক এএসআইয়ের বিরুদ্ধে বিবাদী পক্ষের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগ তুলেছেন বাদীর স্বজনেরা। তবে ওই এএসআই ঘুষ নেয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।
থানায় দেয়া লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ওই গৃহবধূর ১১ বছর ও ৭ বছরের দুটি ছেলে সন্তান রয়েছে। গৃহবধূর স্বামী মৌসুমী বিভিন্ন ফসলের ব্যবসা করেন। এ সুবাদে তার স্বামী মাসে ৩-৪ দিন বাড়ির বাহিরে অবস্থান করেন। ঘটনার প্রায় দেড় আগ থেকে প্রতিবেশী বখাটে তরুণ মো. ইদ্রীস আলী ওই গৃহবধূকে প্রেম নিবেদন ও কু প্রস্তাব দিচ্ছিলেন। তবে প্রস্তাবে গৃহবধূ রাজি হননি। এতে ইদ্রীস আলী গৃহবধূকে চাকু দিয়ে মেরে ফেলার ভয়ভীতি দেখায়। গৃহবধূ এ ঘটনাটি তার স্বামী ও ইদ্রীসের অভিভাবকদের জানান। ইদ্রীসের অভিভাবকেরা এ ঘটনায় ইদ্রীসকে শাসন না করে উল্টো গৃহবধূর স্বামীকে বিভিন্ন হুমকী-ধমকী দিচ্ছিলেন।
শনিবার (১৩ এপ্রিল) রাতে গৃহবধূর স্বামী প্রতিবেশীর বাড়িতে মিলাদ মাহফিলের দাওয়াত খেতে যান। ইদ্রীস আলী ওইদিন রাত সাড়ে দশটার দিকে বাড়িতে ঢুকে গৃহবধূকে জাপটে ধরেন। এতে গৃহবধূ বাধা দিলে ইদ্রীস আলী রাগান্বিত হয়ে তাকে কিল-ঘুষি মারেন। একপর্যায়ে ইদ্রীস আলী গৃহবধূর বাম হাতে কামড় দেয়। এসময় গৃহবধূর চিৎকার দিলে প্রতিবেশী লোকজনেরা ছুটে আসেন। তখন ইদ্রীস আলী ঘরের জানালা ভেঙে বাহিরে পালিয়ে যান। এঘটনাটি জানানোর পর ইদ্রীস আলীর অভিভাবকেরা গৃহবধূর স্বামী-সন্তানদের মারতে উদ্যত হন। অভিযুক্ত ইদ্রীস আলী কিছু দিন আগে জেলও খেটেছে। ইদ্রীস আলীর অত্যাচারে গ্রামবাসীরাও অতিষ্ঠ।
ভুক্তভোগী গৃহবধূর স্বামীর ভাষ্য, এ ঘটনায় রোববার দুপুর সাড়ে থানায় গিয়ে তার স্ত্রী বাদী ইদ্রীস আলীসহ তিনজনের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন। থানার ওসি নয়ন হোসেন অভিযোগটি তদন্তের জন্য এএসআই মো. সাজুকে দায়িত্ব দেন। ওইদিন দুপুরে থানার এএসআই সাজু অভিযোগটি তদন্ত ঘটনাস্থলে আসেন। এএসআই মো. সাজু অভিযুক্ত ইদ্রীস আলীদের বাড়িতেও যান। সেইসময় অভিযুক্ত ইদ্রীস আলী তাদের বাড়িতে ছিলেন।
ভুক্তভোগী গৃহবধূর স্বামী বলেন, আমাদের লোকজন এএসআই সাজুর সঙ্গে ইদ্রীস আলীর কথা বলতে দেখেছেন। এএসআই সাজু ইদ্রীসের অভিভাবকদের সঙ্গে টাকা-পয়সা নিয়ে কথা বলছিলেন। এএসআই সাজু ইদ্রীসের অভিভাবকদের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ নেন। এরপর এএসআই সাজু বাহিরে এসে আমাদের লোকজনদের বলেন, ইদ্রীস আলী বাড়িতে নেই। এএসআই সাজু চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর ইদ্রীস আলী বাড়ির বাহিরে আসেন। এতে তারা সবাই অবাক হয়েছেন।
এঘটনায় রোববার সন্ধ্যায় ভুক্তভোগী গৃহবধূ ও তার স্বামীসহ গ্রামের ৫০-৬০ জন নারী-পুরুষ সঙ্গে নিয়ে থানায় আসেন। তারা অভিযুক্ত ইদ্রীস আলী ও তার বাবাকে থানার ভেতর দেখতে পান। তারা এএসআই সাজু ও থানার ওসির সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা থানায় বসে ঘটনাটি আপস-রফা করতে বলেছেন। তারা আপস-রফা করবেন কি না তা পরে জানাবেন বলে জানিয়ে থানা থেকে চলে আসেন।
ভুক্তভোগী গৃহবধূ বলেন, অভিযোগ দেয়ার সময় পুলিশের কথা শুনে খুব খুশি হয়েছিলাম। তখন মনে হচ্ছিল এখনই পুলিশ অভিযুক্তকে আটক করবে। এএসআই মো. সাজু অভিযুক্তের বাড়িতে যাওয়ার পর সুর পাল্টে গেছে। এখন পুলিশ আমাকে ঘটনাটি আপস করতে চাপ দিচ্ছে। আমি আপস করতে চাইনি।
গৃহবধূর প্রতিবেশী রুবেল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, এএসআই ঘটনাস্থলের এসে বাদীপক্ষের কাছে টাকা চেয়েছিল। তবে বাদি পক্ষ এএসআইকে কোনো টাকা পয়সা দেননি। এ কারণে অভিযোগের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি পুলিশ। এরপর রোববার সন্ধ্যায় গৃহবধূ ও তার স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের ৫০-৬০ জন থানায় গিয়েছিলাম। তখন অভিযুক্ত বখাটে ইদ্রীস আলী, তার স্বজনেরা এবং ওসি তার কক্ষ থেকে বেড়িয়ে আসছিলেন। আমাদের সঙ্গে ওসি থানা চত্বরে কথা বলেছেন। ওসি আমাদের বিষয়টি আপস করতে বলেছেন। আমরা সময় নিয়ে চলে এসেছি।
অভিযুক্ত তরুণ ইদ্রীস আলী সাংবাদিকদের বলেন, গৃহবধূকে শ্লীলতাহানীর ঘটনা সত্য নয়। আমার বিরুদ্ধে থানায় মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছে। পুলিশ আমাকে থানায় আসতে বলেছিল। রোববার সন্ধ্যায় থানায় গিয়েছিলাম। ওসি স্যারের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি আমাকে শাসন করেছেন।
এএস আই সাজু সাংবাদিকদের বলেন, গৃহবধূর শ্লীলতাহানীর অভিযোগটি তদন্ত করতে গিয়েছিলাম। তখন অভিযুক্ত ইদ্রীস আলী বাড়িতে ছিলেন না। সন্ধ্যায় তাকে থানায় আসতে বলা হয়েছিল। ইদ্রীস আলী ও তার স্বজনেরা সন্ধ্যায় থানায় এসেছিলেন। ওসি স্যার ইদ্রীস আলীকে শাসন করেছেন। এ ঘটনাটি ওসি নিজেই দেখছেন। তিনি বিবাদী পক্ষের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ নেয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।
আক্কেলপুর থানার ওসি নয়ন হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে জন্য এএসআই সাজু পাঠানো হয়েছিল। রোববার সন্ধ্যায় দুই পক্ষের লোকজন থানায় এসেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষকে থানায় বসতে বলেছি। বাদী পক্ষ সময় নিয়েছেন। যদি বাদী পক্ষ মামলা করতে চায় তাহলে মামলা নেয়া হবে। এসপি স্যারকে এ বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।





