Thursday, 3 September 2026
শিরোনাম
জেলার খবর

মেলার নামে চলছে অশ্লীল নৃত্য-গাঁজা বিক্রি, বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ

admin • 09 May 2024, 09:29 PM • পঠিত 0 বার
শেয়ার করুন:
মেলার নামে চলছে অশ্লীল নৃত্য-গাঁজা বিক্রি, বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ

সাকিব আল হাসান নাহিদ, জামালপুর।

জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলায় পহেলা বৈশাখ থেকে ওরস ও বৈশাখী মেলার নামে প্রকাশ্য চলছে মাদক সেবন ও বেচাকেনা‌। পাশাপাশি চলছে জুয়ার আসর ও অশ্লীল নৃত্য।‌

তবে উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসন এসব মাদক সেবন ও বেচাকেনা‌ বিষয় জেনেও নিরব থাকার অভিযোগ করেছেন সচেতন নাগরিকেরা। তবে জামালপুরের জেলা প্রশাসক বলছেন,'ওই জায়গায় কোন মেলার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

এদিকে বৃহস্পতিবার (৯ মে) মেলান্দহ ইত্তেফাকুল উলামার আয়োজনে উপজেলার দুরমুট বাজারে হযরত শাহ কামাল ইয়ামনি (রহ.) মাজারকে কেন্দ্র করে মাসব্যাপী ওরস ও বৈশাখী মেলার নামে মুক্তিযোদ্ধা কল্যানের নাম করে অশ্লীল নৃত্য, গান-বাজনা ও গাজা-মদ সেবন বন্ধের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বিকাল ৩টায় উপজেলার পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণে প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে বাইতুল নূর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে সমবেত হন। পরে মসজিদের সম্মুখে ইত্তেফাকুল উলামা মেলান্দহের উপজেলার শাখার সাধারণ সম্পাদক মুফতি সোলাইমান এর সঞ্চালনায় প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য রাখেন, ইত্তেফাকুল উলামা জামালপুর জেলার সভাপতি, মুফতি শামছুদ্দীন, মেলান্দহের উপজেলার সহ-সভাপতি মাওলানা শামছুল হক, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা নুর মোহাম্মদ, শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক মুফতি আবদুল ওয়াহাব, প্রচার সম্পাদক মাওলানা ইসরাফিল প্রমুখ।

বক্তারা বলেন,'প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা হচ্ছে বৈশাখী মেলার নামে পুলিশ প্রশাসন সহ সবাই জানলেও নিরব কেউ এসব অপকর্মের বন্ধ করে না। মেলায় প্রায় ৫০০ গাঁজা বিক্রির দোকান রয়েছে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যানের নামে প্রতিদিন রাতে ওই মেলায় চলে অশ্লীল নৃত্য , মাদক বেচাকেনা, জোয়ারা আসর। এসব অপকর্মের যুব সমাজ ধ্বংসের পথে চলে যাচ্ছে।

খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়,'উপজেলার দুরমুট এলাকায় পীর ও সাধক হযরত শাহ্ কামাল (রহ) ইয়েমেনীর মাজার অবস্থিত। এই মাজারকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরের বৈশাখ মাসের প্রথম দিন থেকেই মাস ব্যাপী বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। মেলাকে কেন্দ্র করেই মাজারে এক কিলোমিটার আশেপাশে বসে মেলার বিভিন্ন দোকান। তবে মেলায় আসা ভক্তদের আস্তানায় প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে গাঁজা। এবার মেলায় ভক্তদের প্রায় ৫০০ ডেরা (আস্তানা) রয়েছে।

এছাড়াও মেলায় বিভিন্ন পণ্যের প্রায় এক হাজার স্টল রয়েছে। প্রতিটি স্টলের জন্য মেলা কমিটিকে দিতে হয় ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এতে মেলায় বাণিজ্য হচ্ছে কয়েক কোটি টাকার।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ,' দুরমুট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকটতম সোহেল নামের একজনের নেতৃত্বেই মাদকের ব্যবসা চলছে। তিনি প্রতি রাতে মাদক বিক্রেতার কাছ থেকে টাকা তোলেন। তার কাছ থেকে গাঁজা না কিনলে গাঁজা বিক্রেতা তাদের কৌশলের পুলিশ প্রশাসনের কাছে ধরিয়ে দেন।

 

বৈশাখী মেলা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে,'হাজারো মানুষের ভিড়। দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলছে মেলাটির নানা কার্যক্রম। বিভিন্ন জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা। মাজার এলাকায় আশেকান-ভক্তের উপচে পড়া ভিড়। মাজারটির দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে পুকুরের পাড়ে, পুকুরসংলগ্ন বাগানে গাঁজা- সেবন ও বিক্রির জমজমাট আসর চলছে প্রত্যেকটি ডেরায় ১০/১২ জন ক‌রে ব্যক্তি র‌য়ে‌ছেন। এ‌দের ম‌ধ্যে ৩-৪ জন সাধু গো‌ছের লোক বাঁকিরা বি‌ভিন্ন জায়গা থে‌কে আগত তরুণ যুবক। প্রতিটি ঘ‌রেই চল‌ছে গাজা বিক্রি এবং সেবন। সিগা‌রে‌টে ভরা‌নো প্রতি‌পিস গাছ বি‌ক্রি করা হ‌চ্ছে ৩০-৫০ টাকায়। আর কোল‌কি‌তে ভরানো গাজা বি‌ক্রি হ‌চ্ছে ১০০ টাকা।

 

পুলিশ ও প্রশাসনের নজরদারি সত্ত্বেও সেখানে প্রকাশ্যে গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকের পসরা সাজিয়েছেন বিক্রেতারা। গাঁজা বিক্রির আস্তানায় চলছে গানের আড্ডা ও গাঁজা সেবন। তবে বেশিরভাগ ভক্তদের আস্তানায় অল্প বয়সী কিশোর ও শিক্ষার্থীরা গাঁজা সেবন করছে। এছাড়াও নেশাখোরেরা সেখানে এসে আড্ডা দিচ্ছেন। এদিকে মেলা এলাকায় সার্কাস নামে রাতে অশ্লীল নৃত্য ও জুয়ার আসরও দেখা গেছে।

 

জামালপুর সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন,'বৈশাখী মেলায় যেসব ভক্তদের আস্তানায় প্রকাশ্যে গাঁজা সেবন চলছে এসব বন্ধের প্রয়োজন। না হলে যুবসমাজ ও শিক্ষার্থীরা মাদক সেবনে আসক্ত হয়ে পড়বে। বিশেষ করে ওই এলাকার তরুণ শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ওই মেলায় গাঁজা সেবন ও বেচাকেনা‌ বিষয়টি উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসন সহ সবাই জানলেও তেমন কোন অভিযোগ পরিচালনা হয় না।

 

দুরমুট এলাকার স্থানীয়রা বলছেন,'এই মেলার জন্য পুরো একমাস এই এলাকার মানুষ শান্তিতে থাকতে পারে না। রাতদিন ২৪ ঘন্টায় উচ্চস্বরে বাজে গান বাজনা। বৈশাখ মাস আসলেই অশান্তি শুরু হয়ে যায় এই এলাকার মানুষদের। এই এলাকার তরুণ ও কিশোরেরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মেলায় গেলেই অল্প টাকায় মিলছে গাঁজা।

 

মেলায় আব্দুল গফুর নামে এক ভক্তের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন,'বহু বছর ধরে এই মেলা চলে আসছে, তবে আগে এতো মেলায় পাগলাদের সমাগম হইতো না। এখন মেলার শুরু না হতে মেলায় বিভিন্ন জায়গায় থেকে পাগলরা এসে এই জায়গায় আস্তানা করে। এই জায়গায় প্রতিদিন রাতে প্রায় পাঁচশ আসর বসে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই প্রকৃত পাগল নাই। দূরদূরান্ত থেকে যেগুলো এসেছে সেগুলা গাঁজার ব্যবসা-বাণিজ্য করতেই এসেছে।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভক্ত বলেন,'আমি এখানে প্রায় ১৭ দিন ধরে এসেছি। এই জায়গায় সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে সোহেল নামে একজন। তার কথাই সবকিছুই হয়। রাত নয়টার পর থেকে আসরের লোকজন বেশি আসতে শুরু করে। দিনের বেলায় তেমন লোকজন থাকে না। গাঁজা ৩০ থেকে ৪০ টাকা করে নিয়ে সেবন করে।

 

কলাবাধা এলাকার কৃষক শামসুল ইসলাম বলেন,'এই মেলার জন্য এই ইউনিয়নের সকল মানুষই অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। এলাকার কিছু প্রভাবশালী মানুষ মেলার নামে গাঁজার জমজমাট ব্যবসা করছে। এক মাসে কমপক্ষে কোটি টাকা ব্যবসা-বাণিজ্য হয়। এটা তো শুধুমাত্র দোকান ভাড়া থেকে নিচ্ছেন মেলা কমিটি। মেলায় গাঁজার আসর না থাকলে মেলা জমে না তাই প্রতিবারেই গাঁজা আসর হয়।

 

এবিষয়ে মেলা কমিটির সভাপতি ও দুরমুট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ খালেকুজ্জামান জুবেরীকে মোবাইল ফোনে একাধিক বার কল দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেনি।

 

এ বিষয়ে মেলান্দহ হানাদার মুক্তকারি ও প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল করিম জানান, এ বিষয়ে আমি জানিনা, মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যানের নামে এমন ঘৃনিত কাজকে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়, আমিও প্রতিবাদকারীদের সাথে।

 

জামালপুরের পুলিশ সুপার মো.কামরুজ্জামান বলেন,'মেলার যদি অনুমতি না থাকে তাহলে মেলা বন্ধ করে দেয়া হবে। এ বিষয়টি আমরা দেখতেছি।

 

জামালপুরের জেলা প্রশাসক শফিউর রহমান বলেন,'ওই জায়গায় আমাদের এখান থেকে কোন মেলার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ওই জায়গায় প্রতি বছর ওরস চলে ওই ভাবেই বলা হয়েছে। মেলার কোন অনুমতি দেওয়া হয়নি।

  সাকিব/মিরর
মন্তব্য (0)

কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্যটি অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।