Thursday, 3 September 2026
শিরোনাম
মতামত

বৈশ্বিক পর্যটনে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা

admin • 14 Dec 2023, 11:30 PM • পঠিত 0 বার
শেয়ার করুন:
বৈশ্বিক পর্যটনে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা

সবুজ, শ্যামল নান্দনিক প্রাকৃতিক দৃশ্যে ভরপুর বাংলাদেশ। পর্যটন খাতে পৃথিবীর জনপ্রিয় অনেক দেশ শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু স্থান, স্থাপনা বা সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। কিছু দেশ শুধু পাহাড়ের সৌন্দর্য, কিছু দেশ সমুদ্রের সৌন্দর্য, কিছু দেশ নান্দনিক স্থাপনা ইত্যাদির জন্য বিখ্যাত।

 

এক্ষেত্রে পর্যটকদের বিভিন্ন দেশ ঘুরাফেরা করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে পাহাড়, সমুদ্র, দ্বীপ, প্রাচীন নান্দনিক স্থাপনা, মানগ্রোভ বন, ছোট বড় অসংখ্য নদী ইত্যাদি নানা প্রকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই বাংলাদেশ। তাছাড়া এই দেশে রয়েছে ঋতু বৈচিত্র্য। ছয় ঋতুতে প্রকৃতি তার আপন মনে নানা সাজে সেজে ওঠে।

   

এমন বৈচিত্র্যময় দেশ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি খুঁজ পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি প্রাপ্ত ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেইজ সাইটে রয়েছে ষাট গম্বুজ মসজিদ, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বাংলাদেশে অবস্থিত।

   

এছাড়া বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কৃত্রিম লেক কাপ্তাই লেক, প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন, সাগর কন্যা কুয়াকাটা, এ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের জন্য বিখ্যাত পার্বত্য চট্টগ্রাম (বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি) চায়ের রাজ্য সিলেট, ঐতিহাসিক দিক, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ইকো ট্যুরিজম ইত্যাদি হতে পারে বাংলাদেশে বৈশ্বিক পর্যটন আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।

 

শুধুমাত্র প্রাকৃতিক দৃশ্যেই বাংলাদেশ অনন্য তা কিন্তু নয়, বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিতেও রয়েছে নানা ধরনের বৈচিত্র্য। বাংলাদেশের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি এবং ভূ-দৃশ্য ভিন্ন ধরনের। জাতিগত এবং সংস্কৃতিগত দিক দিয়েও বাংলাদেশে রয়েছে নানা বৈচিত্র্য। বাংলাদেশের বৃহৎ নৃগোষ্ঠী বাঙালি ছাড়াও আরও অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে এখানে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় এগারোটি ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করে।

   

তাদের প্রত্যেকের রয়েছে সংস্কৃতি, খাবার, পোশাক, ঐতিহ্যগত ভিন্নতা। বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম দেশ। সকল ধর্মের মানুষের বসবাস রয়েছে এদেশে। সারাবছরজুড়ে বিভিন্ন ধর্মের নানা উৎসব পালিত হয়। ধর্মীয় বৈচিত্র্যগুলোও এদেশের পর্যটন সম্ভাবনার অন্যতম হাতিয়ার। বাংলাদেশের মানুষের অতিথি পরায়ণতা, খাবারের বৈচিত্র্যও পর্যটন সম্ভাবনার অন্যতম কারণ। এতো এতো বৈচিত্র্য ভিন্নতা থাকার পরেও কেনো বাংলাদেশের পর্যটনের প্রতি বিদেশিরা আকৃষ্ট হচ্ছে না। পৃথিবীর অনেক দেশ বাংলাদেশের চেয়ে কম বৈচিত্র্য, কম ট্যুরিজম প্রোডাক্ট নিয়েও পর্যটন শিল্পকে করেছে তাদের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি।

 

তাদের জিডিপির প্রায় শতভাগ নির্ভর করে পর্যটন শিল্পের উপর। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পর্যটন শিল্পের অবদান মাত্র চার থেকে পাঁচ শতাংশ। এতো এতো বৈচিত্র্য বিদ্যমান থাকার পরেও কেন বাংলাদেশ বৈশ্বিক পর্যটন শিল্পে পিছিয়ে?

 

এদিকে একটু আলোকপাত করা যাক: সম্প্রতি আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি বৈশ্বিক গ্রুপে বাংলাদেশের পর্যটন স্থানগুলোর মার্কেটিং এর অংশ হিসেবে বান্দরবানের কিছু পর্যটন স্থানের ছবি আপলোড করি। ঐ পোস্টে একজন বিদেশির মন্তব্য ছিলো এমন "আমার মনে আছে যখন আমি গিয়েছিলাম। ভয়ঙ্কর খাবারের বিষক্রিয়ায় প্রথম রাতে আমি হাসপাতালে ছিলাম। বাংলাদেশের বায়ু দূষণ খুবই ভয়ঙ্কর"। অন্য আরেকজন বিদেশির মন্তব্য ছিলো এমন "তারা নারীদের গণধর্ষণ করে এবং শিশুদের নির্যাতন করে"। তাহলে নিশ্চয় বুঝতে পারছেন আমরা বাংলাদেশী সাধারণ মানুষ আমাদের পর্যটন খাত পিছিয়ে পড়ার জন্য কতটা দায়ী। আমাদের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডগুলো, নিজের দেশের প্রতি অসচেতনতা আমাদের দেশকে নেতিবাচকভাবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরছে। ফলে এইদেশ সম্পর্কে যেমন বিদেশিদের মধ্যে ভুল ধারণা জন্ম নিচ্ছে, তেমনি সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ পর্যটন শিল্প থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে।

বাংলাদেশের পর্যটনে অন্যতম সীমাবদ্ধতা গুলো যেনে নেয়া যাক:

পরিচিতির অভাব: অধিকাংশ বিদেশি পর্যটক জানেন না যে বাংলাদেশ একটি পর্যটন কেন্দ্র। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশকে পরিচিত করতে হবে যাতে তারা এখানে ঘুরতে আসে।

দরিদ্র অবকাঠামো : বাংলাদেশের অধিকাংশ অবকাঠামো এখনো পুরনো রয়ে গিয়েছে যেমন রাস্তঘাট, বিমানবন্দর, হোটেল-মোটেল ইত্যাদিতে আধুনিকতার ছোয়া প্রয়োজন।

ভিসা জটিলতা : বিদেশিদের জন্য এখনো বাংলাদেশের ভিসা প্রক্রিয়া নানা ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত জটিল। দীর্ঘ জটিল ভিসা প্রক্রিয়া বিদেশিদের এদেশ ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করে।

নিরাপত্তা ইস্যু : অনেকের ধারণা বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে অনিরাপদ এবং নিরাপত্তাহীন একটি দেশ। তাই অনেক বিদেশি পর্যটক এদেশ ভ্রমণে বিরত থাকে।

 পর্যটন শিল্পে দক্ষ জনবলের অভাব : বাংলাদেশে পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে একদম আঞ্চলিক পর্যায়ের পর্যটন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যটন শিল্পে বিশেষভাবে দক্ষ জনবলের অভাব পরিলক্ষিত হয়। যাদের পর্যটন সম্পর্কিত কোনো ধারনাই নেই। একারণে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে।

 দূষণ : বাংলাদেশের ঢাকার বায়ু দূষণের দিক দিয়ে অনেকবার বিশ্বের শীর্ষ স্থান দখল করেছে। শুধু ঢাকা নয় সমস্ত বাংলাদেশ দূষণের কবলে। বায়ু, প্লাস্টিক, মাটি, পানি, শব্দ দূষণসহ নানাধরণের দূষণে বাংলাদেশ ভুগছে। যা বৈশ্বিক পর্যটকদের এই দেশ ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করে।

স্থানীয়দের মাঝে পর্যটন সম্পর্কীত জ্ঞানের অভাব : পর্যটন শিল্প যে স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়নে অনন্য ভূমিকা রাখতে পারে সেইটা সম্পর্কেই অনেকে জানেননা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লক্ষ করা যায় পর্যটকেরা যখন একদম প্রত্যন্ত অঞ্চলের পর্যটন এলাকাগুলো ভ্রমণ করে তখন সেখানকার স্থানীয় ছোট ছোট বাচ্চারাও পর্যটকদের স্বাগত জানাতে অপেক্ষায় থাকে এবং পর্যটক দেখা মাত্র তারা তাদের নিজের পণ্য বিক্রি করতে এগিয়ে যায়। বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে এখনো সে-ধরনের মনোভাব গড়ে উঠেনি।

 প্রাকৃতিক দূর্যোগ : বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতিনিয়ত নানাধরণের প্রাকৃতিক দূর্যোগের সম্মুখীন হয়। এতে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়। যা পর্যটনের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশ সরকার উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, সেখানে কী পর্যটন খাতের কোনো অবদান আছে? অবশ্যই, ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপি SDG এর ১৭ টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের যে উদ্দেশ্য রয়েছে তার মধ্যে ৬টি লক্ষ্যমাত্রা প্রত্যক্ষভাবে এবং বাকীগুলো পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে পর্যটন শিল্পের সাথে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় প্রতিটি দেশ উন্নত হওয়ার পিছনে পর্যটন শিল্প জড়িয়ে আছে এবং তারা পর্যটন শিল্পকে আরও গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শুধু মাত্র পর্যটনের উপর নির্ভর করেই অনেক দেশ আজ ধনী দেশে পরিণত হয়েছে। তাই বাংলাদেশ সরকারও নানাধরণের পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে পর্যটন শিল্পকে বিকশিত করতে।

 

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দৃষ্টিনন্দন বিশ্বমানের ৩য় টার্মিনাল নির্মাণ, সাগরের কোল ঘেঁষে কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে নির্মাণ, দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনসহ বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। আশা করা যাচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ একটি অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলকে পর্যটন সম্ভাবনার অন্যতম হাতিয়ার মনে করা হচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রতিনিয়ত বিশ্বমানের হোটেল-মোটেল নির্মাণ, নতুন নতুন পর্যটন আকর্ষণ সৃষ্টিসহ দেশের পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

   

বেসরকারি বিভিন্ন হোটেল-মোটেল মালিকদের কাছ থেকে জানা গিয়েছে তারা সরকারের কাছে দাবী জানিয়েছেন পর্যটন শিল্পকে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা করে আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করার জন্য। সেইসাথে সিভিল সার্ভিসেও পর্যটনকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারের সাথে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। পর্যটনের বিকাশ না হলে ২০৩০ সাল নাগাদ SDG এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও বাধাগ্রস্ত হবে।

  লেখক : আলিফ সাঈদ ফাতিক, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজম্যান্ট বিভাগ,  রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
মন্তব্য (0)

কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্যটি অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।