Thursday, 3 September 2026
শিরোনাম
এক্সক্লসিভ

বাবার গন্ধ

Shakib Nahid • 30 May 2026, 10:56 PM • পঠিত 0 বার
শেয়ার করুন:
বাবার গন্ধ
ছোট্টো রিমি আজও দরজার কাছে বারবার ঘুরঘুর করছে।চোখ দুটো বারান্দার শেষ মাথায় আটকে আছে। একটা নির্দিষ্ট শব্দের অপেক্ষায়, একটা পরিচিত পদশব্দের প্রতীক্ষায়।কখন বাবা আসবে।এই প্রশ্নটা তার কাছে কোনো প্রশ্ন নয়, বরং প্রতিদিনের নিঃশ্বাসের মতো স্বাভাবিক অভ্যাস। কারণ বাবা মানেই তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সময়সূচি। বাবা মানেই ঘরের দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা এক টুকরো নিরাপত্তা।বাবা এলেই পকেট থেকে বের হবে কিছু চকলেট কখনো দুধের, কখনো টক-মিষ্টি, কাগজে মোড়ানো রঙিন হাওয়ায় মিঠাই কিংবা আইসক্রিম । আর তখনই শুরু হবে ঝগড়া।রিমি আর তার বড় বোনের মধ্যে,   “আমি বেশি পাব!” “না, আমি আগে দেখেছি!” বন্টনের হিসাব কখনোই ঠিক থাকে না। বরাবর রিমি জেদ করে জিতে যায় কখনো কান্না দিয়ে, কখনো অভিমান দিয়ে, কখনো বাবার কোলে লুকিয়ে। কারণ বাবা আসলেই যুদ্ধ শেষ।রিমি আর তার বড় বোনের এই ছোট্ট যুদ্ধ আসলে কোনো যুদ্ধ নয় এটা শৈশব ভাগাভাগির খেলা, ভালোবাসার হিসাব-নিকাশ, বাবাকে ঘিরে থাকা ছোট ছোট অধিকারবোধ। আর সেই যুদ্ধের একমাত্র বিচারক বাবা।বাবার কোলে মাথা রাখলেই রিমির মনে হয়, পৃথিবীতে আর কোনো শব্দ খারাপ না, পৃথিবীর সব ভয় যেন বাবাকে ভয় পায়, ক্ষুধারাও যেন অপেক্ষা করতে শিখে বাবার কাছে। বাবা যেন শুধু এক অদ্ভুত শান্তি। যেমন প্রতিটি শিশুর কাছে তার বাবার কোলে থাকা মানে একটা অদৃশ্য নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে পৃথিবীর সব অনিশ্চয়তা থেমে যায়। রিমি বাবাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমায় বাবাকে ছাড়া ঘুম আসে না। বাবা যখন অফিস থেকে ফেরে সে বাবাকে জড়িয়ে ধরে, রাতেও সে বাবাকে জড়িয়ে ঘুমায়। বাবার শরীরের গন্ধ তার কাছে কোনো প্রশ্ন নয়, কোনো বিশ্লেষণ নয়,,এটা শুধু বাবার গন্ধ।ঝাঁঝালো, একটু ভারী, একটু অচেনা।কিন্তু রিমির কাছে সেটা কোনো প্রশ্ন নয়।সেটাই তার “বাবার গন্ধ”। বাবার গন্ধ সব সন্তানের জন্যই প্রশান্তির পৃথিবীর সমস্ত সুগন্ধির থেকেও মূল্যবান।বাবা মানেই ঘর ফেরা। বাবা মা নেই আলাদিনের জাদুর চেরাগ যেখানে চাহিবা মাত্রই সব পাওয়া যায় কোন হিসেব কষতে হয় না বাবা মানে এই চোখের তারায় সন্তানের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।বাবা মানেই সন্ধ্যার আলো।বাবা মানেই হাতে করে আনা মুঠো মুঠো আনন্দ।বাবা ভাত খেতে বসলে রিমি তার পাশে চুপচাপ বসে পড়ে।বাবা এক এক করে তাকে খাইয়ে দেয়।ভাত, ডাল, মাছের ঝোল, কখনো মাংসের শেষ টুকরোটা নিজের প্লেট থেকে তুলে "রিমি মা খাও।” বাবা যখন খাইয়ে দেয় সব খাবার যেন বাবার হাতের ছোঁয়ায় আরও সুস্বাদু হয়ে ওঠে।বাবার কণ্ঠে কোনো ক্লান্তি নেই, যেন পৃথিবীর সব ক্লান্তি বাইরে রেখে এসেছে সে।কিন্তু রিমির জীবনে একটা অদ্ভুত রহস্য ছিল।যেটা রিমিকে সবসময় কৌতূহলী করে।আর তা হলো, বাবার বিছানার খাটের তোষকের নিচে লুকানো থাকে একটা সোনালি বাক্স।ওটার ভিতরে থাকে সাদা, লম্বা, কাগজের কিছু কাঠি।বাবা ওগুলো বের করে আগুন জ্বালায়। তারপর ধোঁয়া ওঠে। সকালে দুপুরে দিনে অনেকবার বাবা ওটা বের করেন। বাবা ওই কাঠি ভীষণ পছন্দ করেন। অবশ্য খাওয়া বলা চলে না কারণ কাঠি পুড়ে ছাইটা অ্যাশট্রেতে যায় বাবার স্টোমাকে কিছু যায় না ,ধোঁয়াও উড়ে যায়, যেন আকাশে হারিয়ে যাওয়া কোনো প্রার্থনার মতো।রিমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিল,“বাবা, এটা কি চকলেট?” বাবা একটু গম্ভীর হলেন তারপর,শুধু কিছুটা সময় চুপ ছিল, এরপর বলেছিল “না রে, এটা বড়দের জিনিস।”রিমির খুব ইচ্ছে করত বাবার মত সেও কাঠের উপর আগুন লাগিয়ে ধোয়া বানিয়ে উড়ায়। তার খুব জানতে ইচ্ছে করতো, ওভাবে কাঠিতে আগুন লাগালে কি হয়?ওটা কি মজা লাগে?ওটাও কি কোনো ধরনের চকলেট? নাকি এক ধরনের ধোঁয়া উড়ানোর খেলা?কিন্তু বাবা কখনো তাকে ছুঁতে দেয়নি।বাবার আঙুলের ফাঁকে কাগজের কাঠি পুড়ে নিঃশেষ হতো, আর সেই সোনালি বাক্সটা আবার তোষকের নিচে হারিয়ে যেত।সময় এগিয়ে চলে—নিঃশব্দ, নির্দয়ভাবে।ইদানিং বাবার কাশি একটু বেশি। প্রথমে সবাই বলল, সর্দি-জ্বর, ঋতু বদল, এমন হয়ই। কিন্তু বাবার সর্দি কাশি থামল না ডাক্তার দেখানো হলো ডাক্তার কিছু টেস্ট দিল , তারপর আবার টেস্ট তারপর আবার টেস্ট। রিমির স্কুলে যখন টেস্ট হয়, রিমি বরাবর ফার্স্ট হয় । কখনো টেস্টে একটু খারাপ করলে মা বকে তখন রিমি বাবার কাছে আশ্রয় নেয়। বাবা মাকে বলে পরেরবারিনী অবশ্যই ভালো করবে। রিমি যখন পরীক্ষায় খারাপ করে তখন মায়ের কাছে একটু বকুনি খেলেও সবকিছুতে স্বাভাবিকতা থাকে ,,সবার চোখে এমন হতাশা থাকে না, ভয় আর অনিশ্চয়তা থাকে না।রিমি এসব কিছুই বুঝতে পারে না সময় আরো এগিয়ে যায়। রিমি ইদানিং বুঝতে পারে কিছু একটা বদলে যাচ্ছে। কিছু জিনিস থেমে থাকে।যেমন অপেক্ষা।যেমন গন্ধ, ধোঁয়া, আর বাবার বাড়ি ফেরা। বাবার বাড়ি ফের আস্তে আস্তে পিছিয়ে যেতে থাকলো। বাবা কিছুদিন হসপিটালে ছিল,, রিমি ঘুমাতে পারেনি ,, বাবা কে না জড়িয়ে সে ঘুমাতে পারে না।তারপর অপেক্ষা আরও একটু বাড়ল এখন প্রায়ই বাবাকে ছাড়াই ঘুমাতে হয়।তারপর সেই দরজার সামনে দাঁড়ানোটা আর আগের মতো থাকল না।চকলেটের হিসাবও বদলে গেল।বড় বোন আর ঝগড়া করে না।কারণ চকলেট আসা কমে গেছে।কারন বাবা ইদানিং হসপিটালেই বেশি থাকে।বাবার হাঁটার শব্দও আর আগের মতো ভারী নয়। বাবা কেমন যেন দিন দিন কংকাল সার হয়ে যাচ্ছে। মিমি চোখের সামনে বাবার এমন পরিবর্তন মেনে নিতে পারে না।মায়ের চোখে এখন হিসাব লেখা থাকে,ওষুধ, ডাক্তার, কেমোথেরাপি, আর কী বাকি আছে।রাতের খাবারের টেবিলে এখন আর গল্প নেই।শুধু নিঃশব্দ হিসাব।রিমি একদিন বাবার শার্ট ধরেছিল।সেই একই গন্ধ।কিন্তু এবার সেটা আর শান্তি নয়। কেমন ভয়ের গন্ধ।এবার সেটা একটা থেমে যাওয়া সময়। সেই সময় যখন ডাক্তার বলেছিল শব্দগুলো “ফুসফুসে ক্যান্সার…” রিমি তখন বুঝতে পারেনি ক্যান্সার কী।সে শুধু জানত,,বাবা আগের মতো করে আর চকলেট আনতে পারে না।বাবা আগের মতো করে আর হাসতে পারে না।বাবা আগের মতো করে আর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। অফিস থেকে এসে রিমিকে কোলে তুলে নিতে পারে না।শুধু সেই সাদা ধোঁয়াটা এখন ধীরে ধীরে বাবার ভেতর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। সাথে নিয়ে যাচ্ছে বাবার শরীরের সব রক্ত মাংস ।বাবা কেমন যেন কঙ্কালের মতো রোগা হয়ে গেছে। রিমি কিছুই বুঝতে পারে না। যে ধোঁয়াটা একদিন রিমি ভেবেছিল,চকলেটের মতো কিছু একটা। সেই ধোয়াতে আচ্ছন্ন হয়ে গেল পুরো পরিবারের বর্তমান আর ভবিষ্যৎ, সেই সাদা কাগজের কাঠির আগুন গিলে খেলো একটা হাসি খুশি পরিবার, বাবার বাড়ি ফেরার অপেক্ষা ,বাবার আদর মাখা কন্ঠ, বাবা নামের বট গাছের ছায়া। আজ ৩১ মে। বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। রিমি এখন আর দরজার কাছে দৌড়ায় না।কারণ দরজার ওপারে এখন আর আগের মতো কেউ আসে না।কিন্তু কোথাও একটা সোনালি বাক্স এখনো আছে।যেটা ধীরে ধীরে শুধু একজন মানুষকে নয়,একটা বাবাকে, একটা ঘরকে, একটা শৈশবকে, আর একটা ভবিষ্যৎকে,নিঃশব্দে পোড়াতে থাকে।আমরা চাইনা আর কোন রিমির ভবিষ্যৎ এভাবে তামাকের ধোঁয়ায় উড়ে যাক, পুড়ে যাক কোন হাসিখুশি পরিবারের সুখ শান্তি। আমরা সবাই তামাক থেকে দূরে থাকি। তামাক মুক্ত সমাজ গড়ি।   লেখা: সারাহ আমীন অনার্স তৃতীয় বর্ষ, ইংরেজি বিভাগ ব্রহ্মপুত্র ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, জামালপুর। 
মন্তব্য (0)

কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্যটি অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।