Thursday, 3 September 2026
শিরোনাম
জেলার খবর

দেবীগঞ্জে সরিষার ক্ষেত নষ্ট করে জমি দখলের অভিযোগ

admin • 14 Jan 2026, 10:49 AM • পঠিত 0 বার
শেয়ার করুন:
দেবীগঞ্জে সরিষার ক্ষেত নষ্ট করে জমি দখলের অভিযোগ

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে ট্রাক্টর দিয়ে সরিষার ক্ষেত নষ্ট করে প্রায় ৩৭ বছর ধরে ভোগদখলে থাকা এক একর জমি দখল নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আব্দুল্লাহ মাসুদের বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকাল ১১টার দিকে উপজেলার দেবীডুবা ইউনিয়নের সোনাপোতা মৌজার ধানপাড়া এলাকায় এই ঘটনাটি ঘটে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সোনাপোতা মৌজার ১৬২ নম্বর এসএ খতিয়ানের ৪৭০ নম্বর দাগভুক্ত এক একর জমিতে আব্দুল্লাহ মাসুদ দলবল নিয়ে ট্রাক্টর দিয়ে চাষ দিচ্ছেন। এ সময় জমিতে প্রায় দেড় মাস বয়সী সরিষার চারা দেখা যায়। সরিষার ক্ষেত চাষ দিয়ে সেখানে ভুট্টার বীজ ফেলা হয়।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য ও সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র বিশ্লেষণে জানা যায়, অভিযুক্ত আব্দুল্লাহ মাসুদের বাবা আবুল হোসেন ১৯৭৭ সালে তার দুই মেয়ে আঞ্জুয়ারা বেগম ও ফাতেমা বেগমের নামে জমিটি ক্রয় করেন। যার দলিল নম্বর ছিল ৩৩৭০। পরবর্তীতে ফাতেমা বেগম ১৯৮৯ সালে ৫৫০১ নম্বর দলিলে ৩৩ শতক, ১৯৯২ সালে ৩৯৫৫ নম্বর দলিলে ২০ শতক এবং ২০০৬ সালে ৩৩১৮ নম্বর দলিলে সাড়ে ৭ শতক জমি ভুক্তভোগী আব্দুল মালেকের বাবা আব্দুল কাদের গং এর কাছে বিক্রি করেন। ৫৫০১ নম্বর দলিলে আবুল হোসেন নিজেই সনাক্তকারী ছিলেন।

অন্যদিকে, অপর মেয়ে আঞ্জুয়ারা বেগম ১৯৯৬ সালে ১৩৯ নম্বর দলিলের মাধ্যমে সাড়ে ৬০ শতক জমি মাহাবুবুর রহমানের কাছে বিক্রি করেন। পরবর্তীতে মাহাবুবুর রহমান ওই জমি আব্দুল কাদের গংয়ের কাছে বিক্রি করেন, যার দলিল নম্বর ছিল ৪০৯৮।

১৯৮৯ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মোট চারটি দলিলের মাধ্যমে জমিটির মালিকানা অর্জনের পর আব্দুল কাদেরের স্ত্রী, ছেলে আব্দুল মালেক, ভাই জহির মণ্ডল, চাচাতো ভাই রফিকুল ইসলাম ও তাদের পরিবারের সদস্যরা মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকাল পর্যন্ত জমিটি ভোগদখলে ছিলেন বলে দাবি করা হয়।

অভিযুক্ত আব্দুল্লাহ মাসুদ দাবি করেন, ১৯৭৫ সালে ৬২১৯ নম্বর দলিলের মাধ্যমে তার বাবা আবুল হোসেন রবিউল আলম নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে জমিটি ক্রয় করেন। তবে অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আবুল হোসেনের জীবদ্দশায় ওই দলিলের বিষয়ে কখনো কোনো দাবি বা দখলের চেষ্টা করা হয়নি। এছাড়া ২০০৮ সালে ভূমি জরিপের সময় আব্দুল মালেকরা মাঠ খতিয়ান পান। সে সময় আব্দুল্লাহ মাসুদ পক্ষ কোনো আপত্তি তোলেননি।

আব্দুল্লাহ মাসুদের দাবি, তারা ১৯৭৫ সাল থেকে জমিটি ভোগদখলে ছিলেন এবং ২০২৩ সালে জমিটি তাদের দখলচ্যুত করা হয়। এ অভিযোগে তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেন। বিষয়টি আমলে নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান উভয় পক্ষকে বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জমিতে যেতে নিষেধ করেন। ওই সময় প্রায় তিন মাস জমিটি পতিত অবস্থায় ছিল।

পরে উভয় পক্ষের দলিল ও কাগজপত্র পর্যালোচনা করে ইউএনও মৌখিকভাবে আব্দুল কাদের গংকে জমিতে চাষাবাদের অনুমতি দেন বলে অভিযোগকারীরা জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় দেড় মাস আগে আব্দুল মালেকরা জমিতে সরিষার বীজ রোপণ করেন।

এ বিষয়ে আব্দুল্লাহ মাসুদ বলেন, ১৯৭৫ সালে আমার বাবা জমিটি কিনেছেন। ২০২৩ সালের আগ পর্যন্ত আমরাই দখলে ছিলাম। তারা পরে ইউএনওর কাছে অভিযোগ করে জমিটি প্রায় এক বছর পরিত্যক্ত রাখে। এরপর লাঠিসোঁটা নিয়ে জমিতে ঢুকে সরিষা লাগায়। তারা ১৪৪/১৪৫ ধারায় মামলা করেছিল, সেই মামলায় আমরা রায় পেয়েছি, তাই দখলে এসেছি।

আদালতের রায়ে জমি আব্দুল্লাহ মাসুদের দখলে দেখানোর পর নতুন করে কেন সরিষা নষ্ট করে জমি দখল করতে হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,ওরা এক দেড় মাস আগে সরিষা লাগিয়েছিল কিন্তু সরিষা তেমন ভালো হয়নি। ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর আদালত থেকে আমাদের দখল দেখিয়ে রায় দেয়। আদলতের কাগজপত্র আমাদের হাতে আসতে দেড়ি হয় তাই আমরা ১৩ জানুয়ারি জমিতে হালচাষ দিয়ে দখল নেই।

এইদিকে জমি ও বাদামের আবাদ দখলের চেষ্টার কারণে গত বছর ২৭ মে আব্দুল মালেক আদালতে আব্দুল্লাহ মাসুদের বিরুদ্ধে ১৪৪/১৪৫ ধারায় মামলা দায়ের করেন। এরপর আদালতের নির্দেশের প্রেক্ষিতে দেবীডুবা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ ভূমি সহকারী কর্মকর্তা দিপালী রানী ৯ সেপ্টেম্বর সরেজমিন তদন্ত করে ২৫ মে থেকে জমিটি পতিত অবস্থায় আছে বলে প্রতিবেদন দাখিল করেন। যদিও সে সময় জমিতে বাদামের ক্ষেত ছিল বলে ভুক্তভোগীসহ একাধিক সূত্র নিশ্চিত করে। ভূমি কর্মকর্তার প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত আব্দুল মালেকের আবেদনটি খারিজ করে দেয়।

এই বিষয়ে উপ ভূমি সহকারী কর্মকর্তা দিপালী রানী বলেন, আমি স্বীকার করছি, এখানে আমার কিছুটা ভুল হয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর তদন্তে গিয়ে আমি জমিটি পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখতে পাই। পরে জানতে পারি, ইউএনও স্যারের মৌখিক নির্দেশে তখন জমিটি পরিত্যক্ত রাখা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে জমিটি প্রথম পক্ষ আব্দুল মালেকের দখলেই ছিল এবং সেখানে তিনি বাদাম চাষ করেছিলেন। তবে বাদাম চাষের সময়কাল সম্পর্কে ধারণা না থাকায় আমি মনে করেছিলাম, মামলার সময় অর্থাৎ মে মাস থেকেই জমিটি পরিত্যক্ত ছিল। এই অংশটিতেই আমার ভুল হয়েছে।

এদিকে নালিশি জমির বাইরেও আলাদাভাবে ক্রয় করা আরও সাড়ে ১৬ শতাংশ জমিতে ট্রাক্টর দিয়ে চাষ দিয়ে দখল নেওয়ার অভিযোগ ওঠে আব্দুল্লাহ মাসুদের বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে আব্দুল মালেকের চাচা আমির হোসেন বলেন, ১৯৭৭ সালের দলিলের ভিত্তিতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে জমিটি ভোগদখল করে আসছি। ১৩ জানুয়ারি সকালে নালিশি জমির বাইরেও আমাদের আলাদা সাড়ে ১৬ শতাংশ জমিতে চাষ দিয়ে জোরপূর্বক দখল নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী আব্দুল মালেক বলেন, দলিল অনুযায়ী আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই জমি ভোগ করছি। আমার বাবার জীবদ্দশায় কখনো কোনো বিরোধ ছিল না। ২০২৪ সালের শেষ দিকে হঠাৎ করে দলিলের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জমিটি দাবি করা হয়। ভূমি কর্মকর্তার প্রতিবেদনের ভুল ব্যাখ্যার কারণে আদালত মামলাটি খারিজ করেন। তবে আদালত কোথাও জমিটি দখলে নেওয়ার অনুমতি দেননি। এরপরও আমার সরিষার ক্ষেত নষ্ট করে জমিতে চাষ দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য (0)

কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্যটি অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।