মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অত্যন্ত গর্বের । জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন । বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পুরুষের পাশাপাশি বাঙালী নারী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দ্বারা কত লাখ লাখ নারী সম্ভ্রম হারিয়েছে, নির্যাতিতা হয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রুষা করেছেন তাঁর হিসাব কে রেখেছে??
আজ লিখব তেমনই এক অসীম সাহসী বীরকন্যা জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা পুরষ্কার প্রাপ্ত নারী বীর মুক্তিযোদ্ধা রোকেয়া বেগমের গল্প ।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ,পাক হানাদার বাহিনীর গণহত্যার চালানোর পর শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষণার ডাকে সারা দিয়ে তেঁতুলিয়ার যুবকরা স্বাধীনতার স্বপক্ষে মিটিং মিছিল করে । বীর মুক্তিযোদ্ধা রোকেয়া বেগম তখন নবম শ্রেণির ছাত্রী । চারদিকে অশান্তি, অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা । সারাদেশে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এ সময় তাঁর (রোকেয়া) ভাই নাসিদুল বাবা- মায়ের অনুমতি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ যান রংপুরে । কিছুদিন পর লোকেমুখে শুনতে পান পাক হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে রোকেয়া বেগমের বড় ভাই নাসিদুল শহিদ হয়েছেন। এ খবর শুনে তাঁর মা অসুস্থ হয়ে পরেন, অনেকটা মানষিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন তিনি । তখন নিয়মিত রেডিও শুনতেন, রেডিও খবরে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব গাথা ও নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অংশগ্রহণ কথা শুনে রোকেয়া বেগম মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সীদ্ধান্ত নেন। দেশে তখন চরম বিশৃঙ্খলা । জনৈক ব্যাক্তি ১০ টাকা তাঁর মায়ের হাতে দিয়ে বলেন " তোর ব্যাটা নাশিদুল মরে নি, বাঁচে আছে এই ১০ টাকা তোক পাঠাইছে " তাঁর মাকে সুস্থ রাখার জন্য কেও হয়ত এই কাজটি করেছেন । তবে এই সংবাদটি ছিল গুজব, দেশ স্বাধীনের পর নাশিদুল বাড়ি ফিরেন, অনেক টা পরিবার ও প্রতিবেশি দের অবাক করেই ।
এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে সারাদেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, তেঁতুলিয়া ছাড়া । নারী মুক্তিযোদ্ধা রোকেয়া বেগম জানান - তাঁর বড় ভাই আব্বাস আলীর সাথে তেঁতুলিয়া পার হয়ে ভারতের ভইশপিটা শরনার্থী শিবিরে যান । প্রথমে সেখানে তিনি শিশুদের পাঠ দান করেন । পরে নার্স ( সেবিকা) হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ফিল্ড হাসপাতালে যোগদেন । বাঙালি চিকিৎসকের কাছে বমি, জ্বর, পাতলাপায়খানা, স্যালাইন, ইনজেকশন পুশ ও গ্রেনেট নিক্ষেপের প্রশিক্ষণ নিয়ে অগণিত অসহায় শরনার্থীদের সেবা প্রদান করেন।পরবর্তীতে ভইশপিটা হতে কান্তাইভিটা, তারপর চটের হাট শরনার্থী শিবিরে রোকেয়া বেগম শরনার্থী বাঙালিদের সেবা প্রদান করেন । খবর পান তাঁর মা অসুস্থ নাইট পাস নিয়ে পায়ে হেটে গ্রামের বাড়ি মুনিগছে তাঁর মা কে দেখতে যান । পুনরান শরনার্থী শিবিরে ফেরার সময় - তেতুলিয়া তেঁতুলগাছ তলায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ইপিআর সদস্য ইয়াসিন আলী তাদের আটকান এবং সেবা প্রদান করতে শরনার্থী শিবিরে যাচ্ছেন যেনে তাঁদের সাথে কথা বলে ফিল্ড হাসপাতালে একজন সেবিকা খোঁজা হচ্ছে সেটি জানান এবং ফিল্ড হাসপাতালের ডাক্টার আতিয়ারের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। চারদিকে তখন ভয়, তুমুল যুদ্ধ চলছে, তবে মুক্তি বাহিনীর প্রচেষ্টা ও মিত্র বাহিনীর সহায়তা অমর খানা ব্রীজ ( চাওয়াই ব্রীজ) পর্যন্ত মুক্তাঞ্চল অর্থাৎ পাক হানাদার বাহিনী প্রবেশ করতে পারে নি ।
বীর মুক্তিযোদ্ধা রোকেয়া বেগম তাঁর বড় ভাই আব্বাস আলীকে নিয়ে তেঁতুলিয়া থানার পাশে লম্বা টিনের ঘরের ফিল্ড হাসপাতালে ডাক্টার আতিয়ার রহমানের সাথে দেখা করেন । ডাক্টার আতিয়ার বললেন আহত গুলিবিদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দিতে একজন সেবিকা প্রয়োজন জরুরি ভিত্তিতে। আপনি গুলিবিদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দিতে পারবেন?? রোকেয়া কিছু বোঝার আগেই বললেন পারবো । ডাক্টার আতিয়ার রোকেয়া বেগম কে যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ আহত মুক্তিযোদ্ধাদের দেখাতে নিয়ে গেলেন । কি আর্তনাত! কি চিৎকার! অসহ্য যন্ত্রণা! আবারো ডাক্টার আতিয়ার রোকেয়া বেগম কে বললেন পারবেন তো?? দেশের এই করুণ পরিস্থিতি দেখে রোকেয়া বললেন ইনশাআল্লাহ পারবো স্যার।
তাঁকে তেঁতুলিয়া ফিল্ড হাসপাতালে যোগদান করানো হলো এবং হাতে কলমে সেলাই করা, ব্যান্ডেজ বাধানো,প্যাচ্যানো, ক্ষতস্থান ভালো করে পরিষ্কার করানো, মিকচার তৈরী, বিশেষ করে কারমেন্টিভ মিক্সার তৈরী ইত্যাদি শেখানো হলো । তেঁতুলিয়া হাসপাতালে প্রথমে ১০ বেডের ছিল, আহত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তা ৫০ বেডে উন্নীত করা হয় ।
মুক্তিযুদ্ধ কালিন তিনি নিয়মিত নিরলস ভাবে তেঁতুলিয়া ফিল্ড হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দিতেন । গুরুতর রোগীদের পাশ্ববর্তী ভারতের বাগডোগরা হাসপাতালে পাঠানো হতো ।
তেঁতুলিয়া ফিল্ড হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার পর পঞ্চগড় হসপিটাল , ঠাকুরগাঁও টিবি ও ঠাকুরগাঁও সদর হসপিটালেও তিনি পর্যায়ক্রমে সেবা প্রদান করেছেন।
দেশ শত্রুমুক্ত হওয়া পর্যন্ত রোকেয়া বেগম একনিষ্ঠ ভাবে আহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দিয়েছেন তিনি । তিনি জানান তাঁর চোখে এখনো ভাসে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আর্তনাত । যাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ তাদের যথাযথ মর্যাদা দিই ।
মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় হতে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা পুরষ্কার ২০২২ অর্জন করেন, এছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অনেক পুরষ্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি । তাঁর প্রত্যাশা একটি উন্নত সমৃদ্ধ নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে উঠুক ।





